রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৬তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

0
251

সর্বশেষ আপডেট 2 years আগে | নিউজ ভিশন ২৪

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট: একজন সফল পুরুষের বর্নাঢ্য জীবনের পেছনে যে মানুষটি নিরবে কাজ করে যান সেটি হলো তার স্ত্রী বা সহধর্মিনী। পিতা হাজী মোঃ তায়েব উদ্দিন এবং মাতা তমিজা খাতুনের ঘর আলোকিত করে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর বেষ্ঠিত উপজেলা মিঠামইনের কামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তৃণমূল থেকে রাজনীতি করা এই মানুষটি আজ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন। তার এই দীর্ঘ জীবনের পথচলায় যিনি সবসময় পাশে থেকে সাহস দিয়েছেন তিনি হলেন তার স্ত্রী রাশিদা হামিদ।

আজ ৪ অক্টোবর, কেঁটে গেছে ৫৬টি বসন্ত। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দম্পতির ৫৬তম বিবাহ বার্ষিকী। ৫৬ বছরের এই পথচলায় জীবনের ভালো, খারাপ উভয় সময়েই অত্যন্ত ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে সর্ব অবস্থায় আবদুল হামিদের পাশে থেকে সাহস দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে আজকের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত আসার সুদীর্ঘ পথকে সুগম করে দিয়েছেন স্ত্রী রাশিদা হামিদ। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ গণমাধ্যমে স্ত্রী রাশিদা হামিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা অনেকটা অকপটেই স্বীকার করেন তিনি।

কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে রাশিদা খানম। পিতা মৃত আব্দুল হালিম খানের চার ছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে রাশিদা খানম জৈষ্ঠ্য সন্তান। বাড়ির পাশের বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর ১৯৬৩ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার এসভি সরকারি বিদ্যালয় থেকে তিনি মেট্রিক পাস করেন। পরে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই ১৯৬৪ সালে রাশিদা খানমের সাথে পরিচয় হয় এই ভাটি বাংলার কামালপুর গ্রামের সেই সম্ভাবনাময় তরুণ আবদুল হামিদের সাথে। আবদুল হামিদ তখন তৎকালীন গুরুদয়াল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন জিএস। ধীরে ধীরে পরিচয়, পরিচয় থেকে প্রেম, প্রেম থকে পরিণয়। রাশিদা হামিদ উচ্চ মাধ্যমিক শেষে হওয়ার আগেই বিবাহ বন্ধনে হন আবদুল হামিদের সাথে।

সেই ১৯৬৪ থেকে শুরু পথচলার আজ ৫৬ বছর। নিজের বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য আর বিচক্ষণতায় এই সুদীর্ঘ পথ চলায় রাশিদা হামিদ সর্ব অবস্থায় সকল পরিস্থিতি দক্ষতার সাথেই মোকাবেলা করেছেন। রাজনীতির উত্তাল মাঠে তখন স্বৈর-শাসক আইয়ুব খানের শাসন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে প্রায়ই ঘরের বাহিরে থাকতেন আবদুল হামিদ। অনেকটা ছন্নছাড়াই হয়েছিলেন তৎকালীন আবদুল হামিদ। তার এই ছন্নছাড়া জীবনে আলোর শিখা জ¦ালিয়ে রাশিদা হামিদ ঘর, সংসার অত্যন্ত পরিশ্রম ও ধৈর্যের সাথে সামলাতেন তিনি। আবদুল হামিদ ও রাশিদা হামিদ এখন ৩ পুত্র ও ১ কন্যার গর্বিত পিতা-মাতা। ৪ সন্তানের মধ্যে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক (এমপি) জৈষ্ঠ্য সন্তান, রাসেল আহমেদ তুহিন মধ্যাম সন্তান ও ব্যারিস্টার ও কৃষিবিদ রিয়াদ আহমেদ তুষার কনিষ্ঠ সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে স্বর্ণা হামিদ সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান।

রাজনৈতিক জীবনের অনকেটা সময়ই স্ত্রী ও সন্তানাদির খোঁজ-খবর রাখেতে পারেননি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাজনীতির মাঠে, মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিলেন আবদুল হামিদ। গণমানুষের এই নেতা একদির সবার কাছে পরিচিত হন প্রিয় হামিদ ভাই নামে। মানুষই যেন তাঁর ঘর সংসার, তাঁর ধ্যান, তাঁর সাধনা। জীবনের অনেকটা সময়ই কাটিয়েছেন গণমানুষের সাথে। ভুলে যেতেন নিজ ঘর, সংসারের কথা। ঘর সংসারের প্রতি এতো উদসীনতা নিয়ে রাশিদা হামিদের মনে কোনো অভিমান বা রাগের জন্ম নেয়নি। নিজ সন্তান আর সংসারে দক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন স্ত্রী রাশিদা হামিদ।

আবদুল হামিদ ও রাশিদা হামিদ দম্পতির মিলনের গল্পটা খুব একটা সুখকর ছিলো না। রাশিদা খানমের পরিবার কোনোমতেই রাজনীতি করা ভবিষ্যতহীন আবদুল হামিদের সাথে বিয়ে দিতে কোনো মতেই রাদিজ ছিলো না। কিন্তু প্রেম তো আর বাাঁধা মানে না। তাদের এই শক্ত বন্ধন আলাদা করা ছিলো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু রাশিদা হামিদের ভালোবাসার টান সব কিছুকে উপেক্ষা করে শেষে পর্যন্ত ১৯৬৪ সালের ৪ অক্টোবর বিয়ের পিড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায় দুজনকে। সেই থেকেই আবদুল হামিদ ও রাশিদা হামিদ দম্পতির পথচলা।
রাশিদা হামিদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের এসএসসি পাস করার পর বিয়ে! মামা বিয়ের বিষয়ে মত বদলে ফেলতে পারেন। এজন্য তাড়াহুড়ো করে বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী রাজনীতি করেন। কিশোরগঞ্জে একটি ছোট বাসায় থাকতাম। গ্রামের বাড়ি থেকে ছোট ছোট অনেক দেবর আর ভাগ্নে বাসায় থেকে লেখাপড়া করে। তাদের কেউ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, কেউবা ষষ্ঠ শ্রেণিতে। সারাদিন বাসায় লোকজন লেগেই থাকত। তাদের চা-নাশতা দেয়া, পরিবারের লোকজনের জন্য রান্না, খাওয়ানো সব আমাকে সামলাতে হতো।‘বিয়ের পর হঠাৎ করে এমন অবস্থায় পড়লাম, কোনো অবসর ছিল না।

নিজের দিকে খেয়াল রাখার সুযোগতো ছিলোই না। টানাপোড়েনের সংসার। দিনেদিনে সংসার বড় হতে থাকে। ব্যাঘাত ঘটে নিজের লেখাপড়ায়ও। গভীর রাতে একটু একটু করে পড়ি। এভাবে এইচএসসি পাস করি। স্বামী আর বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের জীবন নিয়ে কোনো চিন্তার সুযোগ পাইনি। তবে আমার স্বামী মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি অতিশয় সহজিয়া ও সৎ রাজনীতিক। এজন্য একদিন সে ভালো করবে- এমন বিশ্বাস ছিল আমার’- এই প্রতিবেদকের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এমনটিই বলছিলেন, দেশের টানা দু’বারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্ত্রী রাশিদা হামিদ।

স্বামীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জেল-জুলুম, হুলিয়া আর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাশিদা হামিদ বলেন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র শিক্ষা আন্দোলন, ছয়দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, সর্বোপরি ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন আর একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আবদুল হামিদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মিঠামইনে গ্রামে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে হয় রাশিদাকে। ডাকাতরা কেড়ে নেয় সবকিছু।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সন্তানদের মুখে সময়মতো খাবার তুলে দিতে পারেননি। মেলেনি প্রয়োজনীয় কাপড়। তবে থামেনি তার জীবন-সংগ্রাম। আবদুল হামিদকে রাজনীতির কারণে বারবার জেলে যেতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালে গ্রেফতার করা হয় আবদুল হামিদকে। দুই বছর পর তাকে জেল থেকে বের করে আনেন রাশিদা হামিদ।

রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠপুত্র বর্তমান সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেন, আম্মার কথা যদি বলি, আম্মা অনেকটা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মতোই। বাবাকে ছোটবেলা থেকেই খুব কম কাছে পেয়েছি। আম্মাই আমাদের সবকিছুর খোঁজ খবর রাখতেন। আম্মাও আব্বার মতো মানুষের পাশে থেকে সারাজীবন পরিবার, এলাকাবাসী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের সেবা করেছেন।

একজন মমতামীয় মায়ের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার আম্মার মাঝে সবকিছুই রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আব্বার অনেকটা সময় কারাবাসেই চলে যেতো। তখন পরিবারের অভাব দেখা দিতো। কিন্তু আম্মা আমাদের কোনো অভাবই বুঝতে দিতেন না। খুব দক্ষতার সাথে আম্মা সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন। এমন মায়ের সন্তান হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করি। আম্মা হলেন আমার জীবনের অনুপ্রেরণা।

রাষ্ট্রপতির মধ্যম পুত্র রাসেল আহমেদ তুহিন বলেন, আম্মা আমাদের পরিবারের সকল সদস্যদের কাছে আদর্শের জীবন্ত প্রতীক। আব্বা রাজনীতির বাইরে পরিবারের খোঁজ নিতে পারতেন না। সবকিছু সামলাতে হয়েছে আম্মাকে। আম্মার কাছে থেকে শুনেছি, পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার পর গোটা পরিবারকে কঠিন সময় পার করতে হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম কেউ ছিল না। চরম অবস্থায় বাধ্য হয়ে ভরণ-পোষণের জন্য আম্মা পরিবারের সবাইকে নিয়ে আশুগঞ্জে মামার বাসায় চলে আসেন। আমরা ছয় মাস সেখানে ছিলাম। আব্বা জেলে থাকার সময় ১৫ দিন পরপর আম্মা আমাদের নিয়ে আব্বাকে দেখতে যেতেন। আইনি বিষয়গুলো নিজেই খোজঁ-খবর নিতেন।

আব্বাকে রাজশাহী জেলে নেয়ার পর আম্মার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন সময় গেছে টাকার অভাবে আমাদের একমাত্র ছোট বোনটি অসুস্থ হয়ে পড়লেও তার চিকিৎসা করাতে পারেননি। তারপরও আম্মা কোনো কিছুর বিনিময়ে কোনো আপস করেননি। অবিচল থেকে আব্বাকে সাহস জোগাতেন।

কুষ্টিয়া জেল থেকে আব্বাকে অসুস্থ অবস্থায় পিজি হাসপাতালে ভর্তি করার পর আম্মা হাইকোর্টে রিট করেন। সেই সময়কার প্রধান বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে দেখা করে বিনাবিচারে আটক করে রাখা আব্বার মুক্তির জন্য তার সহযোগিতা চান।
মাকে নিয়ে গর্বিত তিন ছেলে এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, রাসেল আহমেদ তুহিন ও রিয়াদ আহমেদ তুষার এবং একমাত্র মেয়ে স্বর্ণা হামিদ। তারা জানান, প্রচ- অভাব-অনটনের মধ্যেও কোনোকিছু অপূর্ণ রাখেননি তাদের প্রিয় মা। আবদুল হামিদের মতোই সাধারণ ও সহজিয়া জীবনে অভ্যস্ত বেগম রাশিদা হামিদ।

১৯৭২ সালে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন রাশিদা হামিদ। বর্তমানে রাশিদা হামিদ বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আবদুল হালিম খান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী। প্রতি বছর এ ফাউন্ডেশন কৃতী শিক্ষার্থীদের অনুদান প্রদান করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। কিশোরগঞ্জ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন নামক একটি স্কুল। সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কমর্রত ছিলেন রাশিদা হামিদ।

রাশিদা হামিদ বলেন, স্বামী আবদুল হামিদ জাতীয় সংসদে সাতবার এমপি হয়েছেন। সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা, ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরপর দু’বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এটা আমার জন্য অনেক গর্বের। কারণ আমাদের প্রেমের বিয়েতে পরিবারের কোনো কোনো সদস্যদের বিরোধীতা ছিল। পরে তারা সবাই আমাদের দু’জনার তার সাথে দীর্ঘ ৫৬টি বসন্ত পার করেছি। স্বামীকে যতক্ষণই কাছে পেয়েছি তাকে সাহস দিয়েছি, প্রেরণা দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, তিনি এখনও সেই আগের মতোই আছেন। সংসার জীবন শুরু করেছিলাম এক কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। তখন রাত দেড়টা-দুটার আগে ঘুমাতে পারতাম না। সবাই ঘুমিয়ে গেলে বই নিয়ে পড়তে বসতাম। এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখনও রাত দুটার আগে ঘুমাতে পারি না।

তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আবদুল হামিদকে কতটা ভালোবাসি তা কেবল আমিই জানি। ওকে কলেজ জীবন থেকেই ভালোবাসি, কারণ সে মানুষকে ভালোবাসে। কারও ক্ষতি করে না। তার সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এখনও বঙ্গভবনে লুঙ্গি পরে এলাকার কোন সাধারণ মানুষ এলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠে পড়েন। এ কারণেই এ মানুষটিকে এতবেশি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি।

মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন